৭৭ বছরের রক্ত প্রবাহ -মোঃ বদিউজ্জামান

সংখ্যা নিয়ে খেলাই আমার কাজ
দিনরাত সংখ্যা মিলানো
কখনো কখনো তন্দ্রা ঘোরেও
বাজেট কত?
খরচ কত?
খরচের নামে চুরি কত?
কী যে এক চাকরি!
সংখ্যার হিসাব অবশ্য চিরন্তন
মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণেও তা থাকে,
লিংকন, গান্ধী, নেহেরু, সুভাষের ভাষণেও থাকে
আর যেন কী বলব?
কি যেন বলব? ভুলে যাচ্ছি কেন?
সময় অনেক কথা ভুলিয়ে দেয়
আহা সময়, ক্ষমা কর হে আমায়।
আহা সময়,
তোমাকে নিয়ে আমার কম দুঃখ নয়
অবশ্য সে দুঃখ
ফিলিস্তিনীদের দুঃখের সমান দীর্ঘ নয়।
ফিলিস্তিনীদের দুঃখের নদী
রক্তের নদী, অশ্রুর নদী
যেন শেষ হবার নয়
আচ্ছা ঠিক কত রক্ত ঝরলে
একটি রক্তের সাগর হতে পারে
কেউ কি আপনারা বলতে পারেন?
কেউ কি বলতে পারেন
ঠিক কত অশ্রু হতে পারে
একটি সাগর জলে?
আমার অবশ্য ধারনা নেই
ক্যালকুলেটরে রক্তের হিসাব নিকাশের
কোন সংখ্যা নেই তো, তাই।
আচ্ছা ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে
ফিলিস্তিন ছাড়া আর কোন জাতি কি
৭৭ বছর রক্ত, অশ্রু,আর প্রাণ দিয়েছে
নিজ বাসভূমির জন্য?
কি যে বিক্ষিপ্ত চিন্তা আমার!
আমার জানতে মন চায়,
হিটলার আর সাদা শয়তানটার তফাৎ কী?
বুঝতে পারেননি তাই তো!
আরে ওই যে, শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘাতক
সেই সে যাযাবর শয়তান
যার ঘাড়ে চড়ে আছে আরও
শত শয়তান।
৭৭ সংখ্যাটাও বেশ
বেজোড় সংখ্যা
শুনেছি সৃষ্টিকর্তা নাকি
বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন
তা তিনি বেজোড় সংখ্যার ক্রম
আর কত বৃদ্ধি করবেন?
পৃথিবীবাসীই আর কত দেখবে
সংখ্যার ক্রমানুপাতিক বৃদ্ধি?
আবার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল,
কি সব যে চিন্তা আসে মাথায়!
কোন কোন সময় কী
পৃথিবীর সব শুদ্ধ বিবেক মরে যায়?
যায় হয়তো, হয়তো মরে যায়
না হলে ৭৭ বছরেও মানুষের বোধ হয় না
এ কেমন পৃথিবী? এ কেমন সভ্যতা?
এ কেমন মানবতা? এ কেমন মোড়লপনা?
আহা ! মোড়লরা ভেবেছো
এমনি চলবে বুঝি অনন্তকাল
তাই কী কখনো হয়?
অন্ধকারের বুক ফুঁড়ে একদিন আসবে
আসবেই রক্তরঙে রাঙা প্রভাত
সভ্য মানুষের শুভ্র সকাল
সৃষ্টি হবে মানুষের পৃথিবী
সাক্ষী রবে মহাকাল।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় -মোঃ বদিউজ্জামান

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়
ঘটনাপ্রবাহ আমাকে তাই করেছে
তবে সময়ে সব সয়ে যায়
সয়ে যেতে হয়
সময়ের উল্টোচিত্র দেখার জন্য।
মহাসাগরের তলদেশে
কুঁড়িয়ে পাওয়া মহাদেশ সেও সত্য
তুমিও সত্য, শাশ্বত পৃথিবীর মতো সত্য
সত্যের গায়ে লাগা ধুলিকণা, ও কিছু নয়
বাতাসে কখন পড়বে ঝরে,
সে বুঝতেই পারবে না,
কিন্তু তুমি তো তুমিই
ঈশ্বর যেমন ঈশ্বর
সত্য যেমন সত্য।
কিছু মনে করো না বন্ধু আমার
তুমি রবে নীরবে, সরবে
লোহিতকণিকায় বহমান
জাগ্রত পৃথিবী বোঝে
তোমার সম্মাান।
আবার দেখা হবে, কথা হবে
আমাদের কথার ফুলঝুরি
ফুরোবে না কখনো
তা কখনো ফুরোবার নয়
কেটে যাবে একটু কুয়াশা
দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর মিথ্যে ভয়।

নিঃসঙ্গতা -মোঃ বদিউজ্জামন

বাইরে বাতাস অনেক, ঝড়ো বাতাস
বৃষ্টি ঝড়ছে ,গলিত সাদা রুপোর মতো বৃষ্টি
একটি নেঁড়ি কুকুর ডেকে গেল
অনেকক্ষণ ডাকল
সাড়া নেই সাথী কুকুরের
মরার মতো পড়ে আছে তো আছেই।
দুটি কাক ভিজে ঝপঝপে
ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে ভাব বিনিময় করছে
মাঝে মাঝে পাখা ঝাপটে
দুজন দুজনার মধ্যে উষ্ণতা খুঁজছে।
গাছগুলো বাতাসে নুইয়ে পড়ছে
যেন মাটির কাছে কৃতজ্ঞতায় নত হচ্ছে
আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে
যেভাবে কখনো কখনো
পরাজিত মানুষও উঠে দাঁড়ায়।
আমি ভাবছি তোমার কথা
সেই কতকাল আগের কথা
হাতে হাত রাখার কথা
চোখে চোখ রাখার কথা
ভাবছি বৃষ্টি ভেজা সকাল,দুপুর
আর গভীর রাতের কথা
আমাদের কত যে কথা ছিল!
তারপর ধীরে ধীরে কথা ফুরালো
স্বপ্নগুলো ম্লান হলো
এক সময় সাদা মেঘের মতো উড়ে গেল
কোথায় যে তারা গেল আর ফিরল না!
ঝড়ের শেষে গাছেরাও উঠে দাঁড়ায়
আপন প্রেরণায়
আমাদের প্রেম এতটাই নিঃশেষ
আর কখনো দাঁড়ানো হলো না
পাশাপাশি, গায়ে গা স্পর্শ করে।
এখন ধূসর সময়
বৃষ্টির উষ্ণ ফোঁটার মতো
শুধু মিলিয়ে যাওয়ার সময়
বড় বেশী নিঃসঙ্গতা
শুধু ধূসর স্মৃতিকাতরতা।

দি কোড অব হাম্বুরাবী পর্ব-২ -মোঃ বদিউজ্জামান

শ্রদ্ধেয় ভূপেন হাজারিকা তাঁর গানে বলেছিলেন,
‘ও মালিক সারাজীবন কাঁদাবে যখন,
মেঘ করে দাও, আমায় মেঘ করে দাও
তবু কাঁদতে পারব পরের দুখে
অনেক ভালো দাও
মেঘ করে দাও, আমায় মেঘ করে দাও।’
মেঘ আমি হতে চাইনে। আবার কখনো কখনো মানুষের নিষ্ঠুরতা দেখে মানুষ হয়েছি বলে দুঃখও কম পাইনে। গতমাসেই মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জ্বল ভাতের বিনিময়ে জীবন দিল মেধাবী নামধারী কতিপয় দুর্বৃত্তের হাতে। এই সব মেধাবীদের দেখে আমি চাই না আমার সন্তানেরা অতটা মেধাবী হোক। স্রষ্টা তাদেরকে আমার মতো কম মেধাবী রাখুক এই কামনা করি। মেঘ না হয়েও তোফাজ্জ্বলের জন্য চোখের অনেক পানি ফেলেছিলাম। আহা রে তোফাজ্জ্বল! আহা রে ভাই আমার! স্বাধীন দেশে একমুঠো ভাত খেতে গিয়ে চোর সন্দেহে তোকে জীবন দিতে হলো। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রির্পোটে পিটিয়ে হত্যা করার পরিসংখ্যান আরও ভয়ঙ্কর। শাস্তির চেয়ে বেশী জরুরী এসব ঘটনা যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
হাম্বুরাবীর কোড ২২ এ রাহাজানী ও হত্যার শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় হত্যাকারীর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা বহুত কঠিনতর বিষয়। কত আচারিক প্রক্রিয়া শেষে তবেই না একজন মানুষের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হয়। কিন্তু পিটিয়ে হত্যার শিকার মানুষের জন্য কিছুই লাগে না। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে হাম্বুরাবীর বিচার প্রক্রিয়ার তুলনায় সভ্যতা কতটুকু এগিয়েছে? আমেরিকায় কালোরা এখনো বুটের তলায় প্রাণ দেয়, ফিলিস্তিনে হাজার হাজার নারী-শিশু আর যুবক বৃদ্ধরা প্রাণ দেয়। কিন্তু ন্যায় বিচার কোথায়? শাস্তি কোথায়?
হাম্বুরাবী’র কোডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে ভুল বা ত্রুটির কারণে অপরাধীর কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এমনকি ক্ষমা চাওয়ারও কোন সুযোগ ছিল না। এই আইন সর্ব সমক্ষে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হতো। কাজেই আইন না জানার অজুহাতে কারও কোন অজুহাত তোলার সুযোগ ছিল না। যদিও সেই সময়ে খুব অল্প মানুষই পড়তে লিখতে জানত। হাম্বুরাবী’র কোড অব ল’তে ২৮২টি কোড ছিল। তবে এই কোড অব ল’ এর কোড ১৩ ও কোড ৬৬-৯৯ পর্যন্ত ধারাগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রাচীন ব্যবিলনে ৮ ফুট লম্বা একটি কালো ব্যাসাল্ট পাথরের উপর এই আইনগুলো খোদাই করা ছিল। এটি ইরানের সুসার খুজেস্থান নামক স্থানে ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে আবিষ্কৃত হয়েছিল।
হাম্বুরাবীর কোড অব ল’ পৃথিবীর প্রাচীনতম আইন হিসেবে এর উপর ব্যাপক আলোচনা,সমালোচনা ও গবেষণা হয়েছে। এই কোড অব ল’ এর কিছু সীমাবদ্ধতা ও দ্বান্দ্বিকতা থাকলেও প্রাচীনতম আইন হিসেবে এই কোড অব ল’এর কিছু কিছু কোড রীতিমত বিস্ময়কর। এমনি একটি বিস্ময়কর কোড হচ্ছে –
কোড -৫
যদি একজন বিচারক একটি মামলার রায় বিবেচনা বা ধার্য করে থাকেন, নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, খামবন্ধ করে মৃত্যু দন্ডাদেশ জারী করে থাকেন এবং তারপর ঐ রায় পরিবর্তন করে থাকেন, ঐ বিচারক তিনি যে রায় দিয়েছিলেন ঐ রায় পরিবর্তনের দরুন, যে কেউ তাকে দায়ী করতে পারবে এবং সে (বিচারক) ঐ বিচারে যে রায় ঘোষনা করেছিলেন তার ১২ গুণ জরিমানা পরিশোধ করবেন এবং বিচার পরিষদ হতে যে কেউ তাকে বিচারকের সীট হতে অপসারণ করবেন এবং সে (বিচারক) কখনো বিচারকের আসনে আর ফিরে আসতে পারবে না এবং বিচারকগণ যারা কোন একটি মামলার রায় নিয়ে ব্যস্ত আছেন তারা তার আসনে বসতে পারবেন না।