দি কোড অব হাম্বুরাবী পর্ব-২ -মোঃ বদিউজ্জামান
শ্রদ্ধেয় ভূপেন হাজারিকা তাঁর গানে বলেছিলেন,
‘ও মালিক সারাজীবন কাঁদাবে যখন,
মেঘ করে দাও, আমায় মেঘ করে দাও
তবু কাঁদতে পারব পরের দুখে
অনেক ভালো দাও
মেঘ করে দাও, আমায় মেঘ করে দাও।’
মেঘ আমি হতে চাইনে। আবার কখনো কখনো মানুষের নিষ্ঠুরতা দেখে মানুষ হয়েছি বলে দুঃখও কম পাইনে। গতমাসেই মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জ্বল ভাতের বিনিময়ে জীবন দিল মেধাবী নামধারী কতিপয় দুর্বৃত্তের হাতে। এই সব মেধাবীদের দেখে আমি চাই না আমার সন্তানেরা অতটা মেধাবী হোক। স্রষ্টা তাদেরকে আমার মতো কম মেধাবী রাখুক এই কামনা করি। মেঘ না হয়েও তোফাজ্জ্বলের জন্য চোখের অনেক পানি ফেলেছিলাম। আহা রে তোফাজ্জ্বল! আহা রে ভাই আমার! স্বাধীন দেশে একমুঠো ভাত খেতে গিয়ে চোর সন্দেহে তোকে জীবন দিতে হলো। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রির্পোটে পিটিয়ে হত্যা করার পরিসংখ্যান আরও ভয়ঙ্কর। শাস্তির চেয়ে বেশী জরুরী এসব ঘটনা যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
হাম্বুরাবীর কোড ২২ এ রাহাজানী ও হত্যার শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় হত্যাকারীর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা বহুত কঠিনতর বিষয়। কত আচারিক প্রক্রিয়া শেষে তবেই না একজন মানুষের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হয়। কিন্তু পিটিয়ে হত্যার শিকার মানুষের জন্য কিছুই লাগে না। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে হাম্বুরাবীর বিচার প্রক্রিয়ার তুলনায় সভ্যতা কতটুকু এগিয়েছে? আমেরিকায় কালোরা এখনো বুটের তলায় প্রাণ দেয়, ফিলিস্তিনে হাজার হাজার নারী-শিশু আর যুবক বৃদ্ধরা প্রাণ দেয়। কিন্তু ন্যায় বিচার কোথায়? শাস্তি কোথায়?
হাম্বুরাবী’র কোডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে ভুল বা ত্রুটির কারণে অপরাধীর কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এমনকি ক্ষমা চাওয়ারও কোন সুযোগ ছিল না। এই আইন সর্ব সমক্ষে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হতো। কাজেই আইন না জানার অজুহাতে কারও কোন অজুহাত তোলার সুযোগ ছিল না। যদিও সেই সময়ে খুব অল্প মানুষই পড়তে লিখতে জানত। হাম্বুরাবী’র কোড অব ল’তে ২৮২টি কোড ছিল। তবে এই কোড অব ল’ এর কোড ১৩ ও কোড ৬৬-৯৯ পর্যন্ত ধারাগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রাচীন ব্যবিলনে ৮ ফুট লম্বা একটি কালো ব্যাসাল্ট পাথরের উপর এই আইনগুলো খোদাই করা ছিল। এটি ইরানের সুসার খুজেস্থান নামক স্থানে ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে আবিষ্কৃত হয়েছিল।
হাম্বুরাবীর কোড অব ল’ পৃথিবীর প্রাচীনতম আইন হিসেবে এর উপর ব্যাপক আলোচনা,সমালোচনা ও গবেষণা হয়েছে। এই কোড অব ল’ এর কিছু সীমাবদ্ধতা ও দ্বান্দ্বিকতা থাকলেও প্রাচীনতম আইন হিসেবে এই কোড অব ল’এর কিছু কিছু কোড রীতিমত বিস্ময়কর। এমনি একটি বিস্ময়কর কোড হচ্ছে –
কোড -৫
যদি একজন বিচারক একটি মামলার রায় বিবেচনা বা ধার্য করে থাকেন, নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, খামবন্ধ করে মৃত্যু দন্ডাদেশ জারী করে থাকেন এবং তারপর ঐ রায় পরিবর্তন করে থাকেন, ঐ বিচারক তিনি যে রায় দিয়েছিলেন ঐ রায় পরিবর্তনের দরুন, যে কেউ তাকে দায়ী করতে পারবে এবং সে (বিচারক) ঐ বিচারে যে রায় ঘোষনা করেছিলেন তার ১২ গুণ জরিমানা পরিশোধ করবেন এবং বিচার পরিষদ হতে যে কেউ তাকে বিচারকের সীট হতে অপসারণ করবেন এবং সে (বিচারক) কখনো বিচারকের আসনে আর ফিরে আসতে পারবে না এবং বিচারকগণ যারা কোন একটি মামলার রায় নিয়ে ব্যস্ত আছেন তারা তার আসনে বসতে পারবেন না।
