হৃদয়ের দীনতা প্রকাশে কী গৌরব আছে? -মোঃ বদিউজ্জামান
অতিক্ষুদ্র মিলিবাগও একটি সম্ভাবনাময় বৃক্ষের বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়। রুদ্ধ করে দেয় তার উজ্জ্বল, মোহনীয় পুষ্পের বিকাশ কিংবা ফলে ফলে সৌন্দর্যমন্ডিত হওয়ার গৌরবময় আত্নপ্রকাশকে। ফলে অপ্রকাশের বেদনায় পৃথিবীর প্রাণিকূলের কাছে তার অস্তিত্বের কোন গুরুত্ব থাকে না। একইভাবে সমাজের ও সংগঠনের মানুষের মধ্যেও বিভেদ আর পৃথকীকরণের চেষ্টা বা অপচেষ্টা সমাজ বা সংগঠনের সম্পূর্ণ বিকাশের পথে পাহাড়সমান বাঁধা হিসেবে কাজ করে। সম্ভবত স্বাধীনতার পর আমরা জাগিগতভাবে এমনই একটি কঠিন সময় পার করছি। এর বহুমাত্রিক আলোচনা হতে পারে। নানা মাধ্যমে তা হচ্ছেও। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ও সীমিত দেখার ক্ষমতায় মনে হয়েছে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা নিজেদের ভূমিকার মূল্যায়ন না করেই খুব বেশী অন্যের কাজের বা যোগ্যতার সমালোচনায় মুখর থাকেন। এই সমালোচনা যতটা না সাংগঠনিক ভিত্তিকে মজুবুত করে তার চেয়ে বেশী সংগঠনে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে অনৈক্য, পারস্পরিক অনাস্থা, অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা ও বিদ্বেষমূলক মনোভাবাপন্ন কায়েমে কাজ করে। যা সংগঠনের বৃহত্তর লক্ষ্যার্জনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সবচেয়ে বেশী নষ্ট হয় চেইন অব কমান্ড কাঠামো। কোন কোন সময় চেইন অব কমান্ড কাঠামো প্রতিষ্ঠার নামে নানা দুষ্টবুদ্ধির লোকের কুপ্ররোচনা অথবা শীর্ষব্যক্তি বা ব্যক্তিদের মর্ষকামী মনোভাবের কারণে নির্দোষ কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েও ঝিকে মেরে বউকে শিক্ষা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তাতে ফলাফল আরও খারাপ হয়। কারণ, প্রকাশ না করলেও অন্যরা ঠিক-ই বুঝে যায় স্বাধীন মতামত প্রকাশের বদলে দমিত ও নিরাপত্তামূলক অবস্থানই কেবল বাঁচার পথ। ফলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে শক্তি ও সম্ভাবনা প্রকাশের পরিবর্তে কেবল দিন পার করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে পড়ে। এই পলায়নপর মনোবৃত্তি কোন ভাবেই প্রতিষ্ঠান বা জনস্বার্থের জন্য অনুকুল কোন কাজ করতে পারে না। মুক্তিবুদ্ধির চর্চার জন্য মুক্ত পরিবেশ দরকার। সেখানে হয়তো সব কথাই সবার পছন্দ হবে না। তবে সহনশীলতার শক্তি ও সংস্কৃতি দ্বারাই অপছন্দীয় অংশকে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরী হয় বা হবে। সমালোচনাও সুষ্ঠু সমাজ ও সংগঠনের জন্য অবশ্যই দরকার। সমালোচকের সম্মানে কোন কালেই কোন স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হয়নি। কিন্তু তাই বলে গঠনমূলক সমালোচকের গুরুত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু সমালোচনায় যদি নগ্নভাবে সমালোচকের মনের ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক মনোভাব প্রকাশ ঘটে তবে তা কোনভাবেই গঠনমূলক, গৌরবজনক ও সংশোধনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে না। ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক মনোভাব ক্ষুদ্র মিলিবাগের মতো শুধু বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে, ক্রমপ্রসারণের কারণে তা সংক্রামক ব্যধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে তা যদি বৃহত্তর কোন কমিউনিটির মধ্যে প্রচারিত বা সম্প্রচারিত হয় তাহলে তার ব্যাপকতা আরও বৃদ্ধি পায় । কারণ, অপ্রকাশিত সমালোচক বা বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তিও তখন তার বিদ্বেষ প্রকাশের সুযোগ পায়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মতাদর্শে বিশ্বাস করি যে, “Everybody is genius and has something to say, has something important to say and do.” আপাতদৃষ্টিতে আমরা যাকে কম যোগ্যতা সম্পন্ন মনে করি সময়ে সেই হয়তো এমন কোন কাজ করে ফেলে যা বহু যোগ্যতার দাবীদার ব্যক্তিও কখনো করতে পারেননি বা পারেন না। সময়, পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিগত প্রচন্ড ইচ্ছা, মানবপ্রেম অথবা সংগঠনের প্রতি অকুন্ঠ ভালোবাসা ব্যক্তিকে অন্যন্য সৃষ্টিশীল ও কল্যাণকামী কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। আমাদের ডিপার্টমেন্টেও এরকম কাজের বহু নজির আছে। তাছাড়া ব্যক্তির যোগ্যতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। বহুবিধ যোগ্যতর ব্যক্তিও হয়তো এমন কাজ করে যাতে সংগঠনের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়ার সম্মুখীন হয়। একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোন হতে দেখা যোগ্যতাই আরেকজন ব্যক্তির সামগ্রিক যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না। শীর্ষপদে সমাসীন ব্যক্তি শুধুমাত্র পদের কারণেই এমন কিছু বাড়তি যোগ্যতার সুবিধা লাভ করেন যা তার অধস্তনদের কখনোই থাকে না। কারণ চেয়ার এবং পজিশন একজন নেতাকে, একজন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনেক বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। সব কিছু ভিন্ন দৃষ্টিকোন হতে দেখার সুযোগ করে দেয়। যে সুযোগ নিচের পদের মানুষের থাকে না।
সমালোচনার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে আমি যার সমালোচনা করছি, যার যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছি ঠিক কি কি যোগ্যতায় আমি তার চেয়ে সেরা, আমার কোন কোন কাজ দিয়ে আমি তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ তা মূল্যায়ন করা। কিন্তু আমরা যখন সমালোচনা করি কখনোই নিজের যোগ্যতার মূল্যায়ন করি না। তা করি না বলেই আমরা অন্ধভাবে অন্যের সমালোচনা করে, নিজেদের ক্ষোভ বা বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে মূলত নিজেদের দীনতারই প্রকাশ ঘটাই। তাই সমালোচনা যেন কোন সংগঠনের চেইন অব কমান্ড নষ্টের অনুসঙ্গ না হয় তা উপলব্ধি করেই সমালোচনা করার সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মানা উচিত। আমার পছন্দ বা অপছন্দের দ্বারাই সমাজ, সংগঠনের সবকিছু চালিত হবে ব্যক্তির পক্ষে এমন মনোভাব পোষণ করা স্বাস্থ্যকর নয়। বরং বৃহত্তর কল্যাণই সব সমালোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত।
